পর্নোগ্রাফি আসক্তি প্রভাব ও প্রতিকার

তেইশ জানুয়ারি উনিশশো উনানব্বই আমেরিকার ফ্লোরিডার রেস্টের জেলখানায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে এক ভয়ঙ্কর নরপিশাচ। নাম টেন্ড বান্টি, নিজের মুখেই অন্তত তিরিশ জন নারীকে ধর্ষণের পর খুনের কথা স্বীকার করেছে সে। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছে তার, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে এসে দাঁড়ানো এই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারের এক বিশেষ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় সেদিন।প্রায় আধ ঘন্টা ধরে নেওয়া শেই সাক্ষাৎকারের এক পর্যায় এসে দাবি করে তার বিকৃত সেক্সচুয়ল ফ্যান্টাসির শুরুটা ভায়োলেন্স পর্নোগ্রাফির হাত ধরে।

পর্নোগ্রাফি মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তা প্রথম সতর্কবাণী সম্ভবত বিশ্ববাসী পায় এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে। পরদিন ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে বান্টির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। জীবন অবসান ঘটে আমেরিকার ইতিহাসের সবচাইতে আলোচিত এই সিরিয়াল কিলারের।

{tocify} $title={Table of Contents}

পর্নোগ্রাফি

পর্নোগ্রাফি আজকের যুগের বহুল আলোচিত সমালোচিত ও বিতর্কিত একটি টপিক, এর মরণ নেশার ছোবলে আক্রান্ত বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। বিশেষ করে আমাদের যুবসমাজ যেন ডুবে আছে এর অতল বঙ্কিল গহ্বরে। পর্নোগ্রাফি দেখা ভালো নয়, এ সবাই জানে। কিন্তু কেন ভালো নয় এর ক্ষতিকর দিক কি কি পর্নোশক্তি আমাদের সমাজকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে এ নিয়ে বিশদ আলাপ না করেই শুধু ভালো নয় ভালো নয় বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও কাজের কাজ কিছুই হবে না কারণ এ এমনই এক ভায়াল নেশা চরম পরিণতি সম্পর্কে না জানলে এ পরিত্যাগ করা সহজ নয়।

পর্ণ আসক্তির ক্ষতিকর দিক

পর্ন আসক্তির ক্ষতিকর দিক আর এ থেকে পরিত্রানের উপায় খুঁজতেই আমাদের আজকের আয়োজন। পর্ণ আর বাস্তব জীবনের সেক্স এই দুইয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ, পর্নোগ্রাফি তে যা দেখানো হয় তার অনেকাংশেই মিথ্যা অভিনয় ছাড়া আর কিছুই না।

উদাহরণ একজন পুরুষ প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে এক নারীর সাথে sex করছে, অথচ বাস্তবতা হলো sex এর শুরু থেকে পুরুষের বীর্যপাতের গড় সময়কাল পাঁচ থেকে সাত মিনিট হয়ে থাকে। কারো কারো ক্ষেত্রে কিছু কম বেশি হতে পারে।

অনেক Factor কাজ করে এখানে, তবে গড় হিসেবে এটাই। তো এবার চিন্তা করুন সারা জীবন ধরে পরনে দেখে আসলেন ঘণ্টা কাল ধরে sex চলছে। আর নিজের বেলায় দেখলেন পাঁচ মিনিটেই খেল খতম। সেলফ কনফিডেন্স কোথায় গিয়ে ঠেকবে তখন? আপনার সঙ্গিনী যদি পর্ণ দেখে ভেবেই বসেন অমন দীর্ঘ সময় সাসপেন্ড করতে পারাই নরমাল, তাহলে তো আর কথাই নেই। এখন হয়তো মনে হচ্ছে ওসব যে মিথ্যে অভিনয় তা তো সবাই জানে, আচ্ছা মেনে নিলাম। পরের পয়েন্টে আসি।

নিয়মিত পর্ন দেখার ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় Normalization এর মাধ্যমে। ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলা যাক, ধরুন আপনার আশপাশের প্রায় সবাই ধূমপান করে। আপনি যদিও জানেন ধূমপান ভালো কিছু নয়, তবুও একটা সময় পর আপনার অবচেতন মন ধূমপানের ব্যাপারে সায় দেবে ঠিকি কারণ প্রতিনিয়ত দেখতে দেখতে এই কাজটাকে ডালভাত বানিয়ে ফেলেছেন আপনি।

এভাবে নরমালাইজেশনের ফলে অন্যায়কে অন্যায় মনে না হওয়া ক্ষতিকর কোন কিছুর ক্ষতিকর দিক চোখের সামনে থাকার পরও বুঝতে না পারা। এসব মানুষের অস্থিমায় মিশে আছে, একই ব্যাপার ঘটে পর্নাশক্তির ক্ষেত্রেও।

পর্নোগ্রাফি আসক্তি প্রভাব ও প্রতিকার

পর্ন উপস্থাপণ

এখানে মেয়েদেরকে উপস্থাপন করা হয় ভোগ্য পন্যের মতো, যেন চাইলেই যে কাউকে বিছানায় নিয়ে যাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখানো হয় কনসেন্ট ছাড়াই জোরপূর্বক সেক্স করার পরও নারীটি খুশি, কিন্তু বাস্তবতা কি এমন..? নিশ্চয়ই না Video তে একের পর এক আঘাত করা হচ্ছে নারীর শরীরে। তার উপর violence চালানো হচ্ছে, আবার নারীটা উপভোগও করছে, তাতে আনন্দও পাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবেও কি তা ঘটে..? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি দাতব্য সংস্থা প্রায় চার হাজার Porno Video র ওপর একটি সমীক্ষা চালায়। তাতে দেখা যায় পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ শতাংশ Porn Video তে নারীর উপর নির্যাতন চালানো হয়।

পর্নোগ্রাফি দেখলে কি হয়

পর্নোগ্রাফিতে এমন সব Sexual Fantasy দেখানো হয়, যা বাস্তব জীবনে করতে যাওয়া মানেই বিপদ ডেকে আনা। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের তরুণ সমাজের একটা বড় অংশের জ্ঞান এই পর্নোগ্রাফিতেই সীমাবদ্ধ। প্রতিনিয়ত এখানে যা দেখছে তারা সাধারণ ব্যাপার বলেই ধরে নিচ্ছে সেগুলোকে, ভায়োলেন্স কে আর ভায়োলেন্সই মনে হচ্ছে না। বিকৃত অসুস্থ ফ্যান্টাসিকে মনে হচ্ছে স্বাভাবিক।

এভাবে পুরো sex ব্যাপারটা নিয়েই ভুলে ভরা এক অলিক জগতে আটকে যায় তারা। এই ভুল Concept গুলোকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে গেলেই বাঁধে বিপত্তি, শুরু হয় সঙ্গীর সাথে মনোমালিন্য ভুল বোঝাবুঝি। কোন কোন ক্ষেত্রে তা বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়, অথচ আপনার সঙ্গী পর্নস্টার নন। পর্দায় যা দেখেন বাস্তবতা তেমন নয়।

পর্নোগ্রাফি ও ভালোবাসা

ভালোবাসা দুইজন নারী ও পুরুষের মধ্যে গড়ে ওঠা এক অদ্ভুত রসায়ন, যার সাথে তুলনীয় আর কিছুই নেই হয়তো। ভালোবাসা আছে বলেই পৃথিবী এত সুন্দর। ভালোবাসা আছে বলেই রক্তের সম্পর্ক না থাকার পরেও জীবনসঙ্গীকে নিয়ে আমাদের এত ভাবনা এত আয়োজন। এই ভালোবাসার সাথে Sex এর সম্পর্ক আছে এটা সত্যি, Sex ভালোবাসারই একটি অংশ কিন্তু ভালোবাসা মানে কি শুধুই Sex কখনোই না।

ভালোবাসাকে শুধুমাত্র সেক্সের নিগড়ে বেঁধে রাখে তো বনের পশু, আমরা নিশ্চয়ই তা নই। কিন্তু পর্ণোগ্রাফী থেকে আমরা কি শিখছি..? নো লাভ, No Love No Emotion Only Sex, ভালোবাসা নিয়ে আমাদের উপলব্ধি আমাদের চেতনা সবকিছুই সংকীর্ণ করে ফেলেছে এই পর্নোগ্রাফি।

পর্নাসক্ত ছেলেরা মেয়েদেরকে Sex ডল হিসেবে দেখছে, আর উর্তি বয়সী মেয়েরা পর্ন দেখে ভাবছে ছেলেদেরকে আকৃষ্ট করার উপায় বুঝি শরীর দেখানো। এভাবে গোটা Generation এর কাছে ভালোবাসার সঙ্গাই বদলে যাচ্ছে। কি বেদনাদায়ক।


অনেকে হয়তো ভাবেন সিঙ্গেল আছি তাই পর্ণ দেখি, বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। হ্যাঁ, কারো কারো বেলায় ঠিক হয়ে যায় অবশ্য। কিন্তু সবার বেলায় এমন ঘটে না। এমন অনেক দম্পতি আছেন, যাদের একজনের পর্নো শক্তির মাত্রায় এতই বেশি যে Real life Sex এর প্রতি আগ্রহই নেই।

সঙ্গীর চেয়ে পর্দার পর্নেস্টারের প্রতি আকর্ষণ বেশি, দিনকে দিন এ সমস্যা বেড়েই চলেছে। আপনার নিকটবর্তী কোন সাইক্রিয়াটিস্টের সাথে কথা বলে দেখুন, প্রতিনিয়ত এমন অনেক দম্পতিদের কাউন্সেলিং করে থাকেন তাঁরা।

পর্নোগ্রাফি আসক্তদের মধ্যে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের মাত্রাও আশঙ্কাজনক। সম্প্রতি ইংল্যান্ডে বারো হাজার তিনশো তেইশ জন পর্নাশক্তির উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা যায় যারা এক্সট্রিম পর্ণ দেখে তাদের মধ্যে সহিংসতার প্রবণতা সাধারণের চাইতে অনেক বেশি। আর প্রায় ক্ষেত্রেই এই সহিংসতার শিকার হয় তারই নারী পার্টনার। এর কারণ কিন্তু খুব simple নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখলে মানব মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন ঘটে তাতে ধৈর্য ও সহনশীলতার আত্মনিয়ন্ত্রণ নামতে থাকে তলানিতে, ফলে যা হবার তাই হয়।

ইরেক্টাইল ডিসফাংশন

সোজা বাংলায় বললে পুরুষাঙ্গের উত্থান জনিত সমস্যা, কলিকাতা হারবাল টাইপ অসাধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পোস্টার আর লিফলেটের বদৌলতে।, এই শব্দটি মোটামুটি সবার কাছেই পরিচিত, এই ইরেক্ট্রাল ডিসফাংশন নানা কারণে হতে পারে। তার মধ্যে পর্নোগ্রাফি আসক্তি অন্যতম একটি কারন।

নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখে হস্তমৈথুনের অভ্যাস হয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পর্ণ না দেখলে পুরুষাঙ্গ উদ্ধৃত হচ্ছে না, এমন অবস্থাকে বলা হয় পর্ন ইনডিউসড ইরেক্ট্রাল ডিসফাংশন। এজে কতটা ভয়াবহ তা বলাই বাহুল্য।

আর এ অবস্থায় একবার চলে গেলে পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসাও কঠিন। পর্ণ দেখা ছেড়ে দিলেও এই সমস্যা দূর হতে কোন কোন ক্ষেত্রে বছরও লেগে যেতে পারে।

তবে আশার কথা হলো পর্নোগ্রাফী দেখা পুরোপুরি ছাড়তে পারলে সময় সাপেক্ষ হলেও এ থেকে পুরোপুরি সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা সম্ভব।

18+

পর্নোগ্রাফি ছাড়বো কিভাবে

তো প্রশ্ন হল ছাড়বো কিভাবে..? প্রথম কাজ হলো সোর্স বিনষ্ট করা, আপনার কাছে পর্ণের যত প্রকার সোর্স বা কালেকশন আছে তা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে ফেলুন। এমনিতেও পণ সংরক্ষণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, ভাবুন আপনার কিছু আছে কিনা যা আপনাকে পর্ণ দেখতে প্রলুব্ধ করছে। থাকলে তা থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকুন।

প্রয়োজন ছাড়া স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন। খেয়াল করুন আপনি কোন নির্দিষ্ট সময়ে পর্ণ দেখেন কিনা, এমনটা হলে ওই সময়ে একাকী থাকবেন না। মানুষজনের মধ্যে থাকার চেষ্টা করুন। অহেতুক রাত জাগার অভ্যাস থাকলে তা পরিত্যাগ করুন। রাত যত বাড়তে থাকে পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোন আর নারীর প্রজেক্ট হরমোন নিঃসরণের পরিমান ততই বাড়তে থাকে, যা যৌন আকাঙ্খা সৃষ্টির জন্য দায়ী।

এজন্য গভীর রাতে পর্ন দেখার অভ্যাস থাকে অনেকের, একটি নোটবুক কিনুন, তাতে পন দেখার ক্ষতিকর দিকগুলো লাল কালিতে লিখুন। নোটবুকটি যেন আপনার হাতের কাছেই থাকে তা নিশ্চিত করুন, যখনই পন দেখার ইচ্ছা হবে নোটবুকটি খুলুন আর পড়ুন। তাতে কাজ না হলে নির্জন জায়গা থেকে বেরিয়ে লোকজনের মধ্যে আসুন।

বন্ধুবান্ধব, পরিবার পরিজনের সাথে সময় কাটান কিছুক্ষণের মধ্যে দেখবেন মন পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে, সম্ভব হলে একান্ত কাছের কারুর সাথে সমস্যাটি শেয়ার করুন। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা করুন।

প্রতিবার পন দেখার ইচ্ছা জাগার পর নিজেকে তা থেকে বিরত রাখতে পারলে নিজেকে পুরস্কৃত করুন। নিজেই নিজেকে ট্রিট দিন, ঘুরতে যান, ছোটখাটো গিফট কিনুন নিজের জন্য। এতে করে ধীরে ধীরে কনফিডেন্স boost up হবে আপনার, যেটা যেকোনো আসক্তি কাটাতে সবচাইতে বেশি দরকার নিজের ওপর আস্থা রাখুন।

কখনো নিজেকে দমাতে না পারলে হতাশ না হয়ে পুনরায় দ্বিগুণ উদ্যমে শুরু করুন, মনে রাখবেন যে আসক্তির বিরুদ্ধে লড়ছেন আপনি, তা হিরোইন আসক্তির চেয়ে কম কিছু নয়।

যে যুদ্ধ আপনি শুরু করেছেন যোদ্ধা আপনি একা নন. আপনার মতো লাখো মানুষ এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে হচ্ছে, আপনিও পারবেন শুধু প্রয়োজন, দৃঢ় সংকল্প একাগ্রতা আর কঠোর প্রচেষ্টা।

শেষ কথা

প্রিয় দরিদ্র আইটি'র পাঠক বিন্দু কেমন লাগলো আজকেরে এই আর্টিকেল কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। এমন আরো তথ্যবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল পেতে আমাদের ওয়েবসাইটে নিয়মিত ভজিট করুন। এবং সব সময় সবার আগে সব ধরনের আপডেট পেতে আমাদের Google News ফিড ফলো করে রাখুন।

Post a Comment

Previous Next

نموذج الاتصال

This Template Designed By E10Script